ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রবিবার ভোরে নিহত হয়েছেন বলে ইরানের জাতীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। তাঁর মৃত্যুর খবরে দেশজুড়ে শোক ও অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে। ইসলাম প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন ইরানের অসংখ্য অত্যাচারিত মানুষ, বিশেষত মেয়েরা।
ইরানের জাতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, খামেনেই তাঁর কার্যালয়ের মধ্যেই নিহত হয়েছেন। দেশে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে, যা ইরানে উচ্চপদের ধর্মীয় নেতাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথা।
মাত্র চার বছর বয়সে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে শুরু করেন আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। বাবা সৈয়দ জাভেদ আজারবাইজানের এবং মা ছিলেন পারসি পরিবারের। আমেরিকার এবং পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গে যথেষ্ট ভাল সম্পর্ক ছিল তাঁর। কিন্তু কেন তেহরানের এই কট্টরপন্থী নেতাকে মারতে এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিল আমেরিকা? ট্রাম্পের চোখে কেন তিনি অত্যাচারী ছিলেন?
১৯৩৯ সালে মাশাদে জন্মগ্রহণ করেন খামেনেই। ১৯৭৯ সালের ইসলাম বিপ্লবের আগে ইরানের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিপ্লবটির নেতৃত্ব দেন রুহতোল্লাহ খামেনেই।
রুহতোল্লাহ খামেনেইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আয়াতোল্লাহ খামেনেই শাহ মহম্মদ রেজা পাহেলভিয়ের শাসনকালে বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য একাধিকবার গ্রেফতার হন। বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান ইসলাম প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর তিনি দ্রুত নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
১৯৮৯ সালে রুহতোল্লাহ খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর আয়াতোল্লাহ খামেনেই ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত হন। এই পদটি নির্বাচিত সরকারের ঊর্ধ্বে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বহন করে।
১৯৮৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে খামেনেই সমসাময়িক বিশ্বের দীর্ঘতম সময় দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন।
১৯৮১ সালেও একবার হামলা হয়েছিল, কোনওমতে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন খামেনেই। তেহরানের আবুজায় একটি মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছিল সে বছর ২৭ জুন তারিখে। ঘটনার সময়ে সেখানে হাজির ছিলেন খামেনেই। হামলার জেরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায় তাঁর ডান হাত।
তবে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্তদের কেউ রেহাই পায়নি। ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন খামেনেই। যুদ্ধে সাদ্দামের ইরাককে আটকে দিয়েছিলেন তিনি। জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ইরানে। 'মসিহা' হয়ে ওঠেন ইরানে।
তাঁর শাসনামলে ইরান দেখেছে বিপ্লব-পরবর্তী পুনর্গঠন, পরমাণু বিষয়ক অচলাবস্থা, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের ঢেউ এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
দীর্ঘ দিন ধরেই ইরানকে পরমাণু শক্তিধর হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল তাঁর। পারস্যের প্রতিরক্ষা গবেষকদের ইউরেনিয়াম শুদ্ধকরণের কাজ শুরু হয়েছিল তাঁরই তত্ত্বাবধানে। বিষয়টি জানতে পেরেই প্রমাদ গুনতে শুরু করেছিল ইজরায়েল। এক এক করে ইরানের সামরিক বিজ্ঞানীদের নিকেশ করা শুরু করে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ।
তাঁকে গদি থেকে সরানোর চেষ্টা করছিল আমেরিকাও। খামেনেইয়ের কাছে আমেরিকা ছিল 'শয়তান'। হিজাব বাধ্যতামূলক হওয়ায় ইরানি আমজনতার ক্ষোভ বাড়ছিল খামেনেইয়ের উপর। আন্দোলন দমন করতে বিদেশি ভাড়াটে সেনা নামিয়ে দেন খামেনেই। আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালাতে দ্বিধা করেননি কখনও।
খামেনেইয়ের মৃত্যুর মাধ্যমে ইরান এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। এখন দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করতে হবে, যে প্রক্রিয়া ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন সূত্র অনুযায়ী, খামেনেই নিরাপত্তা পরিষদের উপদেষ্টা আলি শামখানি এবং ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডের প্রধান মহম্মদ পাকপুরের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। তখনই ইজরায়েল হামলা চালায়। ট্রাম্পকে প্রথমে খামেনেইয়ের মৃতদেহ দেখানো হয়। এই হামলায় খামেনেইয়েরর মেয়ে, জামাই, নাতি ও পুত্রবধূরও মৃত্যু হয়েছে।