
অসম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: তেজপুর কেন্দ্র
অসমের আধুনিক তেজপুর একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় বাণিজ্যকেন্দ্রের ঐতিহ্য বহন করে, তেমনই আজ এটি রাজ্যের অন্যতম উন্নত শহরে রূপান্তরিত। শহর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মন্দির এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের চিহ্ন। সাম্প্রতিকালে এই কেন্দ্রটিতে কংগ্রেসের প্রভাব কিছুটা হালকা হয়েছে। বিজেপি–অসম গণপরিষদ (অগপ) জোট গত কয়েক বছরে কার্যত কংগ্রেসকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দিক থেকে তেজপুর বিধানসভা কেন্দ্র— ক্রমশ শাসক জোটের দিকে ঝুঁকেছে।
তবে এবছরের বিধানসভা নির্বাচনে এখানেই আবার জমতে পারে লড়াই। বিজেপি–এজিপি জোটের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে কংগ্রেস। তেজপুর আসনটি সোনিতপুর লোকসভা কেন্দ্র...
অসম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: তেজপুর কেন্দ্র
অসমের আধুনিক তেজপুর একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় বাণিজ্যকেন্দ্রের ঐতিহ্য বহন করে, তেমনই আজ এটি রাজ্যের অন্যতম উন্নত শহরে রূপান্তরিত। শহর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মন্দির এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের চিহ্ন। সাম্প্রতিকালে এই কেন্দ্রটিতে কংগ্রেসের প্রভাব কিছুটা হালকা হয়েছে। বিজেপি–অসম গণপরিষদ (অগপ) জোট গত কয়েক বছরে কার্যত কংগ্রেসকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দিক থেকে তেজপুর বিধানসভা কেন্দ্র— ক্রমশ শাসক জোটের দিকে ঝুঁকেছে।
তবে এবছরের বিধানসভা নির্বাচনে এখানেই আবার জমতে পারে লড়াই। বিজেপি–এজিপি জোটের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে কংগ্রেস। তেজপুর আসনটি সোনিতপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, মোট নয়টি বিধানসভা কেন্দ্রের একটি।
ঐতিহাসিক পটভূমি
১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত তেজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রথম দিকে দুটি পৃথক আসন ছিল— তেজপুর নর্থ এবং তেজপুর সাউথ। পরে ১৯৫৭ সালের সীমা পুনর্বিন্যাসে, এই দুটি আসন বিলুপ্ত হয়ে একটি একক তেজপুর আসন গঠিত হয়।
১৯৫৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত এই কেন্দ্রে মোট ১৫টি বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৭০ সালে একটি উপনির্বাচনও রয়েছে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে কংগ্রেস সাতবার এই আসনে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে অসম গণপরিষদ পাঁচবার জিতেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন দু’বার এবং জনতা পার্টি একবার এই আসন দখল করেছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচনী ফল
অসম গণপরিষদের প্রবীণ নেতা বৃন্দাবন গোস্বামী এই কেন্দ্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছেন। তিনি মোট পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৯৮৫ সালে একবার ইনডিপেন্ডেন্ট হিসেবেও জয়ী হন। ২০১১ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী রাজেন বড়ঠাকুর অগপ-র তৎকালীন বিধায়ক বৃন্দাবন গোস্বামীকে ২১,৫৮২ ভোটে পরাজিত করে আসনটি দখল করেন। তবে ২০১৬ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। অগপ-র বৃন্দাবন গোস্বামী কংগ্রেসের প্রার্থী হিরণ্য ভূঞাকে ৩৪,৬৬৩ ভোটে হারিয়ে আসনটি ছিনিয়ে নেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে অগপ এই আসনটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। দলের প্রার্থী পৃথিরাজ রাভা কংগ্রেসের অনুজ কুমার মেচকে ১০,১২৩ ভোটে পরাজিত করেন।
বিজেপি–অগপ জোটের সমীকরণ
তেজপুর কেন্দ্রের রাজনীতিতে বিজেপি ও অগপ-র মধ্যে একটি কৌশলগত সমঝোতা দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর। এই সমঝোতা অনুযায়ী তেজপুর বিধানসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অগপ, আর সোনিতপুর লোকসভা আসনে লড়ে বিজেপি। এই সমীকরণ জোটের পক্ষে বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে। ২০০৯ সালে তেজপুর বিধানসভা অংশে অগপ কংগ্রেসের থেকে ৩,৩৩৩ ভোটে এগিয়ে ছিল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এখানে ১৩,১১৩ ভোটের লিড পায়। ২০১৯ সালে সেই ব্যবধান দাঁড়ায় ৭,৩৫৯ ভোটে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির লিড আরও বেড়ে ৩০,১৫২ ভোটে পৌঁছায়, যা এই অঞ্চলে জোটের শক্তি স্পষ্ট করে।
ভোটার পরিসংখ্যান
২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী তেজপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ১,৭৫,৫৬৩ জন ভোটার রয়েছেন।
২০২৫ সালের বিশেষ পুনর্বিবেচনা (SIR) এই কেন্দ্রকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেনি। ২০২৪ সালের ১,৭৪,৮৯২ ভোটারের তুলনায় এখানে মাত্র ৬৭১ জন ভোটার বেড়েছে।
তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ২০২১ সালের ভোটার তালিকা থেকে ৭,৬৩৭ জন ভোটার বাদ পড়ে। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল ১,৮২,৫২৯।
এর আগে ভোটারের সংখ্যা ছিল—
২০১৯ সালে ১,৮০,৩৪৮
২০১৬ সালে ১,৬৩,১৭৯
২০১১ সালে ১,৫১,৪৫১।
জনসংখ্যার সামাজিক গঠন
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী তেজপুরের ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৩১.৭০ শতাংশ মুসলিম। তফসিলি জাতির ভোটার প্রায় ৫.৫৪ শতাংশ, আর তফসিলি উপজাতির সংখ্যা ১.৪০ শতাংশ। এই কেন্দ্রটি সামাজিক গঠনের দিক থেকে একটি মিশ্র আসন। মোট ভোটারের প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলে এবং বাকি ৪০ শতাংশ শহুরে এলাকায় বসবাস করেন।
ভোটদানের প্রবণতা
তেজপুরে ভোটদানের হার সাধারণত বেশ উচ্চ। ২০১১ সালে তা কিছুটা কমে ৬৯.৭৭ শতাংশ হয়েছিল। তারপর থেকে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে ভোট পড়ে ৮২.০৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৭৯.৬৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৮২.১০ শতাংশ।
ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক পরিচয়
তেজপুরের ইতিহাস বহু প্রাচীন। মধ্যযুগে এই অঞ্চল প্রথমে কোচ রাজাদের শাসনে ছিল। পরে ষোড়শ শতকে এটি আহোম সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। আহোম শাসকেরা প্রশাসনের পাশাপাশি সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, যার প্রভাব এখনও তেজপুরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে স্পষ্ট। মধ্যযুগে এই অঞ্চলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে ১৬৮২ সালের ইতাখুলি যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভৌগোলিক দিক থেকে তেজপুর অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্তর তীরে, অসমের আপার অসম অঞ্চলে। চারপাশে উর্বর সমতল ভূমি, মাঝেমধ্যে ঢেউ খেলানো উচ্চভূমি এবং নদীর মনোরম দৃশ্য এই অঞ্চলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে ভারালি এবং জিয়া ভারালি নদী এই ভূপ্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
অর্থনীতি ও যোগাযোগ
তেজপুরের অর্থনীতি প্রধানত নির্ভর করে—
চা বাগান, কৃষিকাজ (বিশেষ করে ধান ও সবজি উৎপাদন), শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র এবং ছোট ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর।
পরিকাঠামোর দিক থেকে এলাকাটি যথেষ্ট উন্নত। ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৫ এই শহরের মধ্য দিয়ে গেছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করে। রেল যোগাযোগ রয়েছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের তেজপুর স্টেশন থেকে।
পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলির মধ্যে রয়েছে—
বিশ্বনাথ চরিয়ালি (প্রায় ৭৫ কিমি পূর্বে), গোহপুর (প্রায় ৬০ কিমি পূর্বে), রঙ্গাপাড়া (প্রায় ৪০ কিমি উত্তরে), অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগর (প্রায় ১৬০ কিমি উত্তরে) এবং নগাঁও (প্রায় ১২০ কিমি পশ্চিমে)। অসমের রাজধানী দিসপুর বা গুয়াহাটি এখান থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার পশ্চিমে।
২০২৬ নির্বাচনের সম্ভাবনা
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে তেজপুরে রাজনৈতিক লড়াই যথেষ্ট আকর্ষণীয় হতে চলেছে। গত এক দশকে কংগ্রেস এই কেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। তবু দলটির সংগঠন এখানে পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। শাসক বিজেপি–অগপ জোট আপাতত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, কংগ্রেস যদি সংগঠন পুনর্গঠনে সফল হয়, শক্তিশালী প্রার্থী দেয় এবং ভোটারদের সামনে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরতে পারে— তবে তেজপুরে ফলে অপ্রত্যাশিত মোড়ও দেখা যেতে পারে। তেজপুরের ভোটাররা বরাবরই সচেতন। তাই ২০২৬ সালের নির্বাচন এই ঐতিহাসিক শহরের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে কি না, তা এখন দেখার অপেক্ষা।
Input Ajay Jha
Anuj kumar mech
INC
Janmoni borah
ASMJTYP
Alok nath
IND
Nota
NOTA
Nayanmoni choudhury
SUCI
Sheikh mohammad sadique
IND
Akash jyoti singha
IND
Hiranya bhuyan
INC
Sukendra nath
AIUDF
Nota
NOTA
Bizit saikia
IND
Nayan moni choudhury
SUCI
Bhabananda deka
IND
Sujit sarma
JMBP
Mahendra bhuyan
NCP