
অসম নির্বাচন ২০২৬: প্রথমবার ভোটে ডিমৌ
অসমের শিবসাগর জেলার একটি উপ-বিভাগীয় শহর ডিমৌ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রটি প্রথমবারের জন্য ভোটের লড়াইয়ে। নির্বাচন কমিশনের ২০২৩ সালের সীমা পুনর্বিন্যাসের (Delimitation) ফলে গঠিত নতুন এই কেন্দ্রটি সাধারণ (অসংরক্ষিত) আসন এবং যোরহাট লোকসভা কেন্দ্রের ১০টি বিধানসভা অংশের একটি।
সীমা পুনর্বিন্যাসের ফলে ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত থাওড়া বিধানসভা কেন্দ্র বিলুপ্ত হয় এবং তার জায়গায় তৈরি হয় ডেমো বিধানসভা কেন্দ্র। ভোটারদের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টনের লক্ষ্যে অসমে একাধিক কেন্দ্রের সীমানা বদল ও নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই প্রক্রিয়ারই ফল এই নতুন ডিমৌ কেন্দ্র।
ডিমৌ মূলত একটি গ্রামীণ-উপশহরীয় অঞ্চল। ...
অসম নির্বাচন ২০২৬: প্রথমবার ভোটে ডিমৌ
অসমের শিবসাগর জেলার একটি উপ-বিভাগীয় শহর ডিমৌ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রটি প্রথমবারের জন্য ভোটের লড়াইয়ে। নির্বাচন কমিশনের ২০২৩ সালের সীমা পুনর্বিন্যাসের (Delimitation) ফলে গঠিত নতুন এই কেন্দ্রটি সাধারণ (অসংরক্ষিত) আসন এবং যোরহাট লোকসভা কেন্দ্রের ১০টি বিধানসভা অংশের একটি।
সীমা পুনর্বিন্যাসের ফলে ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত থাওড়া বিধানসভা কেন্দ্র বিলুপ্ত হয় এবং তার জায়গায় তৈরি হয় ডেমো বিধানসভা কেন্দ্র। ভোটারদের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টনের লক্ষ্যে অসমে একাধিক কেন্দ্রের সীমানা বদল ও নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই প্রক্রিয়ারই ফল এই নতুন ডিমৌ কেন্দ্র।
ডিমৌ মূলত একটি গ্রামীণ-উপশহরীয় অঞ্চল। ডিমৌ ব্লকের অধীনে প্রায় ১২৫ গ্রাম নিয়ে এই বিধানসভা কেন্দ্রেটি তৈরি হয়েছে। ভোটারদের বড় অংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা—চাষি, ছোট ব্যবসায়ী এবং আপার অসমের জাতিগত বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। শহুরে ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে এখানে কম।
ইতিহাসের দিক থেকে ডিমৌয়ের নিজস্ব কোনও বিশেষ উল্লেখযোগ্য অধ্যায় নেই। তবে শিবসাগর জেলার বৃহত্তর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই এর পরিচয় গড়ে উঠেছে। প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে (১৭৮৮ সাল পর্যন্ত) আহোম রাজাদের রাজধানী ছিল শিবসাগর। সেই ঐতিহ্যের ছাপ এখনও দেখা যায় আশপাশের অঞ্চলে—বিশেষ করে শিবসাগর শহরের ঐতিহাসিক পুকুর ও মন্দিরগুলিতে। যদিও ডিমৌয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, যুদ্ধ বা বড় ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না।
যদিও ডিমৌ এখনও পর্যন্ত কোনও বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তার পূর্বসূরি থাওড়া কেন্দ্রটি ২০২১ পর্যন্ত মোট ১৫টি বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সেই ইতিহাসে কংগ্রেসই ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি—১০ বার জয়ী হয়েছে তারা। বিজেপি জিতেছে দু’বার। সিপিআই, অসম গণপরিষদ এবং একজন নির্দল প্রার্থী একবার করে জয় পেয়েছেন।
২০১১ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের সুশান্ত বর্গোহাঁই কুশল দেওয়ারিকে ৪,২৮৬ ভোটে হারিয়ে আসনটি দখল করেন। দেওয়ারি ২০০৬ সালে নির্দল প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন। তিনি একসময় আল্ফা (ULFA)-র সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তই তাঁর রাজনৈতিক ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়—২০১৬ সালে তিনি বিজেপির টিকিটে লড়ে তৎকালীন কংগ্রেস বিধায়ক বর্গোহাঁইকে মাত্র ১,২২৬ ভোটে হারান।
কিন্তু থাওড়ার রাজনীতিতে অল্প ব্যবধানের লড়াই এবং 'মিউজিক্যাল চেয়ার'-এর খেলা চলতেই থাকে। ২০২১ সালের নির্বাচনে আবারও কংগ্রেসের সুশান্ত বর্গোহাঁই মাত্র ২,০০৬ ভোটে দেওয়ারিকে হারিয়ে আসনটি ফিরে পান।
এরপর নাটকীয় মোড়। বর্গোহাঁই বিজেপিতে যোগ দেন, ফলে ২০২১ সালে উপনির্বাচন হয়। সেখানে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে তিনি রাজিজোর দলের প্রার্থীকে ৩০,৫৬১ ভোটে পরাজিত করেন। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস তৃতীয় স্থানে নেমে যায়। থাওড়া বিধানসভা অংশে ভোটের প্রবণতায় বরাবরই কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০০৯ সালে কংগ্রেস বিজেপির থেকে ৫,৩১৭ ভোটে এগিয়ে ছিল। ২০১৪ সালে বিজেপি উলটে ১০,১০৮ ভোটের লিড নেয়। ২০১৯ সালে সেই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ২,৬৪৫ ভোটে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নতুন ডিমৌ বিধানসভা অংশ প্রথমবার ভোট দেয়। সেখানে কংগ্রেস ১৬,০৫৫ ভোটে বিজেপিকে পিছনে ফেলে। কংগ্রেস পায় ৭৭,৯৩৪ ভোট (৫৪.৫৬ শতাংশ), বিজেপি পায় ৬১,৮৭৯ ভোট (৪৩.৩২ শতাংশ)।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে ডিমৌ কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৭৮,৩৯০। ২০২৪ সালে যা ছিল ১,৭৬,৩১৮- অর্থাৎ, বেড়েছে ২,০৭২ জন। সীমা পুনর্বিন্যাসের ফলে নতুন এলাকা যুক্ত হওয়ায় ভোটার সংখ্যায় বড় লাফ দেখা গেছে। থাওড়া কেন্দ্রে ২০২১ সালে ভোটার ছিল ১,১৪,২২১। ২০১৯ সালে ১,০৮,৪১৫, ২০১৬ সালে ৯৭,৩১৭ এবং ২০১১ সালে ৯৪,৬৯৬। থাওড়া কেন্দ্রে তপশিলি জনজাতির ভোটার ছিল ১২.৪৬ শতাংশ, তপশিলি জাতি ৩ শতাংশ এবং মুসলিম ভোটার ৫.৩০ শতাংশ। ডিমৌ গঠনের পর এই অনুপাত কিছুটা বদলানোর সম্ভাবনা থাকলেও, সামগ্রিকভাবে এটি এখনও একটি গ্রামীণ এবং সাধারণ শ্রেণির ভোটারপ্রধান কেন্দ্র। থাওড়ায় ভোটদানের হার বরাবরই অত্যন্ত বেশি ছিল। ২০১১ সালে ৮২.১৯ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৫.৭২ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৮২.৯৪ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৮৬.৮৮ শতাংশ ভোট পড়ে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নতুন ডিমৌ অংশেও সেই প্রবণতা বজায় থাকে- ভোট পড়ে ৮২.০২ শতাংশ।
জনসংখ্যাগত গঠনের দিক থেকে (মূলত ২০১১ সালের জনগণনা এবং নতুন সীমারেখা অনুযায়ী অনুমান করা তথ্য) এই কেন্দ্রে তপশিলি জনজাতি, তপশিলি জাতি এবং মুসলিম ভোটারের উপস্থিতি অসমের অনেক কেন্দ্রের তুলনায় কম। ভোটারদের বড় অংশই অসমিয়া ভাষাভাষীর, আহোম সম্প্রদায় এবং অন্যান্য আদিবাসী ও সাধারণ শ্রেণির জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ।
ভৌগোলিকভাবে ডিমৌ শিবসাগর জেলার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সমতল অলুভিয়াল ভূমিতে অবস্থিত। এখানে মূলত ধান চাষ এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। ডিসাং ও ডিমৌ নদীর কারণে বর্ষাকালে বন্যার ঝুঁকি থাকে। কৃষি, ছোট ব্যবসা, ইটভাটা শিল্প এবং কৃষি-সংক্রান্ত কাজই এখানকার প্রধান জীবিকা।
উর্বর মাটি ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত কৃষিকাজকে টিকিয়ে রাখে। সড়কপথে জাতীয় ও রাজ্য সড়কের মাধ্যমে আশপাশের শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। নিকটতম রেলস্টেশন শিবসাগর টাউন বা মোরান—গ্রামের অবস্থান অনুযায়ী দূরত্ব প্রায় ১৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার।
ডিমৌর নিকটতম বড় শহর শিবসাগর, জেলা সদর, প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। মোরান প্রায় ২০–২৫ কিলোমিটার এবং যোরহাট প্রায় ৫০–৬০ কিলোমিটার দূরে। রাজ্যের রাজধানী দিসপুর/গুয়াহাটি এখান থেকে প্রায় ৩৫০–৩৮০ কিলোমিটার পশ্চিমে।
২০২৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাই ডিমৌ একেবারেই অনিশ্চয়তায় মোড়া একটি কেন্দ্র। অতীতের নির্বাচনী ইতিহাস সরাসরি নেই। ২০২৪ সালে কংগ্রেস এগিয়ে থাকলেও, তা অনেকটাই জোরহাটের সাংসদ গৌরব গগৈয়ের ব্যক্তিগত প্রভাবের ফল—কংগ্রেসের প্রতি ভোটারদের নিখাদ সমর্থনের নয় বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
ফলে ২০২৬ সালে ডিমৌতে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। নতুন এই কেন্দ্রে কোনও দলই এখনও স্পষ্টভাবে ‘ফেভারিট’ হয়ে উঠতে পারেনি।
By Ajay Jha