
অসম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: মার্গেরিটা কেন্দ্র
তিনসুকিয়া জেলার একটি ছোট শহর হলেও মার্গেরিটা উত্তর অসমের অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক মানচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কয়লা ও চা শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জনপদটি পাহাড়, ঘন অরণ্য এবং বিস্তীর্ণ চা-বাগান ঘেরা এক বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত। ব্রিটিশ শাসনকালে ইতালির রানি মার্গেরিটার নাম অনুসারে এই শহরের নামকরণ হয়। এর আগে এলাকাটির নাম ছিল মা-কুম, যার অর্থ স্থানীয় উপভাষায় 'সব গোত্রের আবাসভূমি'। বিপুল কয়লা খনি ও বাণিজ্যের জন্য একসময় এই অঞ্চল 'কোল ক্যুইন' নামেও পরিচিত ছিল।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মার্গেরিটার ইতিহাস বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে এটি কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে গত এক দশকে ছবিটা বদল...
অসম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: মার্গেরিটা কেন্দ্র
তিনসুকিয়া জেলার একটি ছোট শহর হলেও মার্গেরিটা উত্তর অসমের অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক মানচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কয়লা ও চা শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জনপদটি পাহাড়, ঘন অরণ্য এবং বিস্তীর্ণ চা-বাগান ঘেরা এক বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত। ব্রিটিশ শাসনকালে ইতালির রানি মার্গেরিটার নাম অনুসারে এই শহরের নামকরণ হয়। এর আগে এলাকাটির নাম ছিল মা-কুম, যার অর্থ স্থানীয় উপভাষায় 'সব গোত্রের আবাসভূমি'। বিপুল কয়লা খনি ও বাণিজ্যের জন্য একসময় এই অঞ্চল 'কোল ক্যুইন' নামেও পরিচিত ছিল।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মার্গেরিটার ইতিহাস বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে এটি কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে গত এক দশকে ছবিটা বদলেছে। বর্তমানে এই কেন্দ্রটি ক্রমশ বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। পরপর দুই বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছে এবং লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলে দলটির প্রভাব ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। মার্গেরিটা বিধানসভা কেন্দ্রটি ডিব্রুগড় লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত দশটি বিধানসভা আসনের একটি।
নির্বাচনী ইতিহাস
১৯৭৮ সালে মার্গেরিটা বিধানসভা কেন্দ্র গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে মোট ১১টি বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৯৮ সালে একটি উপনির্বাচনও ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে কংগ্রেসই দীর্ঘদিন ধরে এই কেন্দ্রের রাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রেখেছিল। ১৯৮৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা আটবার কংগ্রেস এই আসনে জয়ী হয়। প্রথম নির্বাচন অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে জয়ী হয়েছিল জনতা পার্টি। পরে ২০১৬ সাল থেকে বিজেপি এখানে পরপর দু'বার জয়লাভ করেছে।
প্রধান রাজনৈতিক লড়াই
কংগ্রেস নেতা প্রদ্যুত বরদলৈ বহু বছর ধরে মার্গেরিটার রাজনীতির মুখ ছিলেন। ২০১১ সালের নির্বাচনে তিনি বিজেপির প্রার্থী কমাখ্যা প্রসাদ তাসাকে ১৬,৬০৯ ভোটে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো আসনটি জয় করেন। এর আগে তিনি তিনবার এই কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যায়। বিজেপির ভাস্কর শর্মা প্রদ্যুত বরদলৈকে ২২,৭৪৪ ভোটে পরাজিত করে আসনটি দখল করেন।
২০২১ সালের নির্বাচনে ভাস্কর শর্মা আবারও জয়ী হন। তিনি কংগ্রেসের মনোরঞ্জন বরগোহাঁইকে ৫৮,৫০০ ভোটের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন। এতে স্পষ্ট হয় যে গত কয়েক বছরে মার্গেরিটায় বিজেপির প্রভাব দ্রুত বেড়েছে।
লোকসভা নির্বাচনের প্রবণতা
লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও মার্গেরিটা বিধানসভা অংশে একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস অসম গণপরিষদকে ৯,৩৮৪ ভোটে পিছনে ফেলে এগিয়ে ছিল। তবে ২০১৪ সালে বিজেপির উত্থানের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সেই নির্বাচনে বিজেপি কংগ্রেসের থেকে ২৫,৭৬৯ ভোটে লিড পায়। ২০১৯ সালে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪,০১০ ভোটে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপি এখানে স্বচ্ছন্দ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল।
ভোটার তালিকা ও পরিবর্তন
২০২৫ সালের বিশেষ পুনর্বিবেচনা (SIR) মার্গেরিটা বিধানসভা কেন্দ্রকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেনি। ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী এই কেন্দ্রে মোট ১,৭৬,১০৯ জন ভোটার রয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে ৮,৮৭৭ জন, কারণ ২০২৪ সালে ভোটার সংখ্যা ছিল ১,৬৭,২৩২। তবে এর আগে ২০২৩ সালের অনুরূপ এক প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন ঘটে। ২০২১ সালের ভোটার তালিকা থেকে ২৫,৬৬৪ জন ভোটারের নাম বাদ পড়ে। তখন মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১,৯২,৮৯৬।
এর আগে ভোটার সংখ্যা ছিল— ২০১৯ সালে ১,৮৩,৯০৭। ২০১৬ সালে ১,৬১,২৯৮ এবং ২০১১ সালে ১,৫৮,৬৩৬।
সামাজিক গঠন
মার্গেরিটা বিধানসভা কেন্দ্রে কোনও একক সামাজিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠী এত বড় নয় যে তারা এককভাবে নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে পারে। এখানে তফসিলি উপজাতি ভোটার সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী, মোট ভোটারের প্রায় ৬.৭৬ শতাংশ। মুসলিম ভোটার প্রায় ৫.৩০ শতাংশ, এবং তফসিলি জাতির ভোটার ২.২৩ শতাংশ। এই কেন্দ্রটি প্রধানত গ্রামীণ এলাকা। মোট ভোটারের ৮৩.৬৯ শতাংশ গ্রামে বসবাস করেন, আর মাত্র ১৬.৩১ শতাংশ ভোটার মার্গেরিটা শহরে থাকেন।
ভোটদানের প্রবণতা
মার্গেরিটা কেন্দ্রে ভোটদানের হার বরাবরই রাজ্যের গড়ের তুলনায় বেশি। ২০১১ সালে সর্বনিম্ন ভোট পড়েছিল ৭৭.১২ শতাংশ। এরপর ২০১৬ সালে তা দাঁড়ায় ৭৯.৮৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৭৯.২৭ শতাংশ, আর ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৮২.৪৭ শতাংশ ভোট পড়ে।
ইতিহাস ও ভূগোল
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশরা যখন এই অঞ্চলের কয়লাকে কেন্দ্র করে শিল্প বিস্তার শুরু করে, তখনই ইতালির রানি মার্গেরিটার নাম অনুসারে শহরের নামকরণ করা হয়। এর আগে এলাকার নাম ছিল মা-কুম— যার অর্থ সব গোত্রের আবাসভূমি।
বিস্তীর্ণ কয়লা খনি ও কয়লা বাণিজ্যের জন্য এই অঞ্চল দ্রুত পরিচিতি পায় 'কোল ক্যুইন' নামে। অসমের প্রাথমিক শিল্পায়নে মার্গেরিটার কয়লা খনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলটি আপার অসমে অবস্থিত। চারদিকে পাহাড়, চা-বাগান এবং বনভূমি ঘেরা এই অঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দিহিং নদী। শহরের উপকণ্ঠে পাহাড়ের পাদদেশে একটি মনোরম গল্ফ কোর্সও রয়েছে। এখানকার ভূপ্রকৃতি মূলত সমতল উপত্যকা এবং ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে ওঠা পাহাড়ি অঞ্চলের মিশ্রণ। গড় উচ্চতা প্রায় ১৫০ মিটার। দিহিং নদী এবং তার উপনদীগুলি চা চাষ এবং ক্ষুদ্র কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থনীতি
মার্গেরিটার অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে কয়লা খনির উপর নির্ভরশীল ছিল। যদিও বর্তমানে সেই শিল্পের গুরুত্ব কিছুটা কমেছে।
এখনও এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হল— চা বাগান, কয়লা খনি (ক্রমশ হ্রাসমান), তেল ও গ্যাস শিল্প সম্পর্কিত কার্যকলাপ, কাঠ ব্যবসা, ধান চাষ এবং ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য।
যোগাযোগ ও পরিকাঠামো
মার্গেরিটা সড়কপথে যথেষ্ট সংযুক্ত। ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৫ এবং রাজ্য সড়কপথের মাধ্যমে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত। রেল যোগাযোগ রয়েছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের মার্গেরিটা স্টেশন থেকে।
নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলির মধ্যে রয়েছে— তিনসুকিয়া (জেলার সদর, প্রায় ৫০ কিমি পশ্চিমে), ডিগবয় (প্রায় ৩৫ কিমি পূর্বে), ডুমডুমা (প্রায় ৩০ কিমি পূর্বে), দুলিয়াজান (প্রায় ২৫ কিমি পশ্চিমে) এবং
নাহরকাটিয়া (প্রায় ৪০ কিমি দক্ষিণে)। অসমের রাজধানী দিসপুর বা গুয়াহাটি এখান থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পশ্চিমে। অরুণাচল প্রদেশের সীমানা প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে।
২০২৬ নির্বাচনের সমীকরণ
২০২৩ সালে ২৫,৬৬৪ জন ভোটারের নাম বাদ পড়া এবং পরে ২০২৫ সালে ৮,৮৭৭ জন নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ার ফলে রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে অনেক পর্যবেক্ষকের মত। এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একসময়ের কংগ্রেস ঘাঁটিতে বিজেপির শক্তিকে আরও মজবুত করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
কংগ্রেস যদি মার্গেরিটায় তার পুরনো প্রভাব ফিরিয়ে আনতে চায়, তবে দলটিকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সংগঠন পুনর্গঠন, শক্তিশালী প্রার্থী এবং বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বার্তা— এই তিনটি দিকেই জোর দিতে হবে। অন্যথা বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মার্গেরিটা আসন ধরে রাখতে বিজেপিকে খুব বেশি পরিশ্রম করতে নাও হতে পারে।
By- Ajay Jha
Manoranjan borgohain
INC
Sanjay kumar deb
ASMJTYP
Ignatius ekka
IND
Nota
NOTA
Rantu sonowal
IND
Bhogeswar shyam
IND
Pradyut bordoloi
INC
Nota
NOTA
Nidan purty
IND
Bishwanath singha
IND
Umesh bora
IND
Purna chetri
IND