
ঘাটাল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত একটি বিধানসভা কেন্দ্র। এক সময় এটি ছিল বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি, তবে সেই দিন অতীত। এখন ঘাটাল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির একটি রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দান।
ঘাটাল একটি আধা-শহর বিধানসভা কেন্দ্র, যা তৈরি হয়েছিল ১৯৫১ সালে। এই কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে ঘাটাল পুরসভা, ঘাটাল-খড়ার পুরসভা, ঘাটাল ব্লক এবং দাসপুর-১ ব্লকের তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত। এটি ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের একটি বিধানসভা অংশ। রাজ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া এখন পর্যন্ত সব ১৭টি বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে ভোট গ্রহণ হয়েছে। প্রথম দুটি নির্বাচনে এটি ছিল যুগ্ম আসন। ১৯৫২ সালে অবিভক্ত সিপিআই দুটি আসনই জেতে, আর ১৯৫৭ সালে কংগ্রেস উভয় আসন দখল করে। সামগ্রিকভাবে সিপিআই(এম) এখানে...
ঘাটাল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত একটি বিধানসভা কেন্দ্র। এক সময় এটি ছিল বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি, তবে সেই দিন অতীত। এখন ঘাটাল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির একটি রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দান।
ঘাটাল একটি আধা-শহর বিধানসভা কেন্দ্র, যা তৈরি হয়েছিল ১৯৫১ সালে। এই কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে ঘাটাল পুরসভা, ঘাটাল-খড়ার পুরসভা, ঘাটাল ব্লক এবং দাসপুর-১ ব্লকের তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত। এটি ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের একটি বিধানসভা অংশ। রাজ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া এখন পর্যন্ত সব ১৭টি বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে ভোট গ্রহণ হয়েছে। প্রথম দুটি নির্বাচনে এটি ছিল যুগ্ম আসন। ১৯৫২ সালে অবিভক্ত সিপিআই দুটি আসনই জেতে, আর ১৯৫৭ সালে কংগ্রেস উভয় আসন দখল করে। সামগ্রিকভাবে সিপিআই(এম) এখানে আধিপত্য বিস্তার করেছে—মোট ১০ বার জয়, যার মধ্যে ১৯৭৭ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত টানা সাতটি জয় রয়েছে। অবিভক্ত সিপিআই আরও দুটি জয় যোগ করলে দেখা যায়, ১৭টির মধ্যে ১২ বার বামপন্থীরা জিতেছে। কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস দু’বার করে এই আসন জিতেছে, আর বিজেপি প্রথমবার জেতে ২০২১ সালে।
তৃণমূল যুগে ঘাটালে দলের উত্থানে শঙ্কর দোলাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১১ সালে তিনি সিপিআই(এম)-এর ছাবি পাখিরাকে ১৬,২৭৭ ভোটে হারিয়ে তৃণমূলের হয়ে আসনটি জেতেন। ২০১৬ সালে আরও বড় ব্যবধান —১৯,৪৭৯ ভোটে—সিপিআই(এম) প্রার্থী কমলচন্দ্র দোলুইকে হারিয়ে জয় ধরে রাখেন। কিন্তু ২০২১ সালে চিত্র বদলে যায়। বিজেপির শীতল কাপাট মাত্র ৯৬৬ ভোটের ব্যবধানে দোলাইকে হারিয়ে ঘাটালে বিজেপির প্রথম বিধানসভা জয় নিশ্চিত করেন। এর ফলে স্পষ্ট হয় যে এখানে লড়াই বাম বনাম তৃণমূল থেকে সরে তৃণমূল বনাম বিজেপিতে রূপ নিয়েছে।
লোকসভা নির্বাচনে ঘাটাল বিধানসভা অংশের ফলাফলও দেখায় যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবধান ক্রমশ কমছে। ২০০৯ সালে সিপিআই তৃণমূলের থেকে ১৬,৫১৬ ভোটে এগিয়ে ছিল। ২০১৪ সালে তৃণমূল বড় উত্থান ঘটিয়ে সিপিআই-এর উপর ৫০,৪২৭ ভোটের লিড নেয়। এরপর থেকে ব্যবধান কমেছে। ২০১৯ সালে তৃণমূল বিজেপির থেকে ৫,৮৬৬ ভোটে এগিয়ে ছিল এবং ২০২৪ সালে এই লিড কমে দাঁড়ায় ৪,৪০৫ ভোটে। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এখানে এখন একতরফা আধিপত্য নয়, বরং দু'দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
২০২৪ সালে ঘাটালে মোট নথিভুক্ত ভোটার ছিলেন ২,৮৮,৩১৭ জন। এই সংখ্যা ২০২১ সালে ছিল ২,৭৯,৯০৮ জন, ২০১৯ সালে ২,৭০,২১৭ জন, ২০১৬ সালে ২,৫৭,১৬৩ জন এবং ২০১১ সালে ২,২৪,৯১৬ জন। তফসিলি জাতির ভোটার, যাদের জন্য আসনটি সংরক্ষিত, মোট ভোটারের ২৭.৮২ শতাংশ। তফসিলি উপজাতি ভোটার ২.১৩ শতাংশ এবং মুসলিম ভোটার ৭.৫০ শতাংশ। এই কেন্দ্রটি প্রধানত গ্রামীণ, এর ৮০.৭০ শতাংশ ভোটার গ্রামে থাকেন এবং ১৯.৩০ শতাংশ শহরাঞ্চলে। ভোটদানের হারও তুলনামূলকভাবে এই কেন্দ্রে বেশি। ২০১১ সালে ৮৬.২০ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৪.১৬ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৮০.১১ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৮০.৫০ শতাংশ।
এক সময় যখন তাম্রলিপ্ত বঙ্গোপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল, তখন ঘাটাল একটি ছোট নদীবন্দর হিসেবে কাজ করত। বর্তমান শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার পূর্বে ‘বন্দর’ নামে পরিচিত স্থানে নৌকা ও ছোট জাহাজ ভিড়ত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলটি দ্বারকেশ্বর, শিলাবতী, দামোদর ও ঝুমি নদীর মিলনস্থলে পরিণত হয়, ফলে নদীপথে বাণিজ্যে ঘাটালের গুরুত্ব বেড়ে যায়। তুলা বস্ত্র, তসর রেশম এবং কাঁসার বাসনের জন্য ঘাটাল প্রাথমিক পর্যায়েই পরিচিতি লাভ করে। ডাচরা এখানে একটি কারখানা স্থাপন করেছিল এবং ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিক পর্যন্ত এই কার্যকলাপ চলতে থাকে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৮৬৯ সালে ঘাটাল পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঘাটাল অবস্থিত নিম্ন শিলাবতী অববাহিকার সমতল পলিমাটির সমভূমিতে এবং এটি দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি। শিলাবতী নদী (যা সিলাই নামেও পরিচিত) শহরটিকে দ্বিখণ্ডিত করেছে এবং বন্দরের কাছে দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে মিলিত হয়ে রূপনারায়ণ নামে প্রবাহিত হয়েছে। নিম্ন উচ্চতা, কংসাবতী ও দামোদর নদীর উজানে জলাধার থেকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত জলছাড়া এবং রূপনারায়ণের জোয়ারভাটার প্রভাব—এই সব মিলিয়ে ঘাটাল এলাকায় ঘনঘন বন্যা হয়। গত এক দশকে বহু বছর এখানে বিধ্বংসী বন্যা হয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতি মূলত উর্বর কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল। ধান প্রধান ফসল, সঙ্গে সবজি ও কিছু তেলবীজ চাষ হয়। তবে বর্ষার বন্যায় প্রায়ই খরিফ ফসল নষ্ট হয় এবং বপন ব্যাহত হয়, ফলে অনেক কৃষক প্রধান মৌসুম বাদ দিয়ে শীতকালীন চাষে মনোযোগ দেন। বহু পরিবার কৃষিশ্রম, ছোট ব্যবসা, পরিবহণ, মৎস্যজীবিকা এবং নিয়মিত বা মৌসুমি কাজের জন্য খড়্গপুর, মেদিনীপুর ও কলকাতার মতো বড় শহরে গিয়ে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে আয় বৈচিত্র্য করে।
ঘাটাল সড়ক ও সেতুর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পশ্চিম মেদিনীপুর ও আশপাশের জেলাগুলোর সঙ্গে যুক্ত। জেলা সদর মেদিনীপুর শহর সড়কপথে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। খড়্গপুর প্রায় ৮০ কিলোমিটার এবং কলকাতা প্রায় ১২০–১৩০ কিলোমিটার দূরে। জেলার মধ্যে চন্দ্রকোনা, সবং ও পিংলার সঙ্গে জেলা ও রাজ্য সড়কপথে যোগাযোগ রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে রূপনারায়ণ পার হয়ে কাঁথি এবং উপকূলবর্তী দীঘায় যাওয়া যায়। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে দামোদর ও দ্বারকেশ্বর উপত্যকা ধরে বাঁকুড়া ও বর্ধমানের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। রেল যোগাযোগের জন্য মেদিনীপুর ও খড়্গপুর জংশনের উপর নির্ভর করতে হয়, যেখান থেকে বাস ও সড়কপথে ঘাটালে পৌঁছনো যায়।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ঘাটাল বাম দুর্গ থেকে ধীরে ধীরে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান হয়ে উঠেছে। কাগজে-কলমে তৃণমূলের অবস্থান এখনও কিছুটা শক্ত। ২০১১ সালের পর দুটি বিধানসভা জয় এবং এই অংশ থেকে টানা তিনটি লোকসভা লিড। তবে বিজেপিও এখন প্রায় সমান জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে বর্তমানে পদ্ম শিবিরের বিধায়ক রয়েছে এবং লোকসভা নির্বাচনে গেরুয়া বাহিনী তৃণমূলের থেকে খুব অল্প ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছে। ২০১৯ সালে ২.৭০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১.৯০ শতাংশ ভোটে পিছিয়ে আছে বিজেপি। অন্যদিকে, বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোট এখানে কার্যত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে; সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাদের সম্মিলিত ভোট শতাংশ ৫-এরও কম। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঘাটালে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে তীব্র ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মঞ্চ তৈরি হয়েছে, যেখানে সামান্য ভোটের ওঠানামাই জয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
Shankar dolai
AITC
Kamal chandra dolui
CPI(M)
Anjan jana
SUCI
Nota
NOTA
Tapan kumar dolui
IND
Kamal chandra dolui
CPM
Anjushree dolui
BJP
Tanmoy dolui
IND
Anjan jana
SUCI
Nota
NOTA