
কলকাতার জনপ্রিয় এলাকা বেহালায় অবস্থিত জেনারেল ক্যাটাগরির বিধানসভা কেন্দ্র বেহালা পশ্চিমের নির্বাচনী ইতিহাস জটিল ও বহুস্তরীয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, শতাব্দীর শুরু থেকে এই কেন্দ্রটি কার্যত তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গ। যেখানে রাজ্যের বর্তমান শাসকদল এখনও পর্যন্ত অপরাজিত।
বেহালা পশ্চিমের নির্বাচনী যাত্রা মূলত ৩টি পর্বে ভাগ করা যায়। মূল বেহালা বিধানসভা কেন্দ্রটি গঠিত হয় ১৯৫১ সালে এবং ১৯৬২ পর্যন্ত টিকে ছিল। এই পর্বে অনুষ্ঠিত ৩টি নির্বাচনের মধ্যে ১৯৫২ সালে অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক আসনটি জেতে, আর ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালে জয়ী হয় CPI। ১৯৬৭ সালে কেন্দ্রটি ভাগ হয়ে বেহালা ইস্ট ও বেহালা ওয়েস্ট হয়। এই বিন্যাস ২০০৬ পর্যন্ত বজায় ছিল। বর্তমান রূপ, অর্থাৎ বেহালা পূর্ব ও বেহালা পশ...
কলকাতার জনপ্রিয় এলাকা বেহালায় অবস্থিত জেনারেল ক্যাটাগরির বিধানসভা কেন্দ্র বেহালা পশ্চিমের নির্বাচনী ইতিহাস জটিল ও বহুস্তরীয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, শতাব্দীর শুরু থেকে এই কেন্দ্রটি কার্যত তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গ। যেখানে রাজ্যের বর্তমান শাসকদল এখনও পর্যন্ত অপরাজিত।
বেহালা পশ্চিমের নির্বাচনী যাত্রা মূলত ৩টি পর্বে ভাগ করা যায়। মূল বেহালা বিধানসভা কেন্দ্রটি গঠিত হয় ১৯৫১ সালে এবং ১৯৬২ পর্যন্ত টিকে ছিল। এই পর্বে অনুষ্ঠিত ৩টি নির্বাচনের মধ্যে ১৯৫২ সালে অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক আসনটি জেতে, আর ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালে জয়ী হয় CPI। ১৯৬৭ সালে কেন্দ্রটি ভাগ হয়ে বেহালা ইস্ট ও বেহালা ওয়েস্ট হয়। এই বিন্যাস ২০০৬ পর্যন্ত বজায় ছিল। বর্তমান রূপ, অর্থাৎ বেহালা পূর্ব ও বেহালা পশ্চিম কার্যকর হয় ২০১১ সালের বিধানসভা পুনর্বিন্যাসের পর।
বেহালা পশ্চিম তার পুরনো রূপে মোট ১১ বার ভোটে অংশ নেয়। যার মধ্যে ৯ বারই জয় পায় বাম দলগুলি। এর ফলে বৃহত্তর বেহালা এলাকায় টানা ১২টি নির্বাচনী জয়ের রেকর্ড গড়ে ওঠে বামেদের। এই ১১টির মধ্যে CPIM ৮ বার এবং CPI একবার জেতে। ২০০১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথমবার এই বাম দুর্গে ফাটল ধরায়। তারপর থেকে দলটির জয়ের ধারা অব্যাহত রয়েছে। এখনও পর্যন্ত টানা ৫টি বিধানসভা নির্বাচন জিতেছে তৃণমূল, প্রতিবারই প্রার্থী ছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
২০১১ সালে বেহালা ওয়েস্টের নাম বদলে বেহালা পশ্চিম করা হয় এবং সীমানায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমান বিন্যাসে কেন্দ্রটি কলকাতা পুরসভার ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ১১৮, ১১৯ এবং ১২৫ থেকে ১৩২ নম্বর ওয়ার্ড রয়েছে। ফলে এটি সম্পূর্ণ শহুরে চরিত্রের একটি কেন্দ্র। এটি কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত একটি বিধানসভা আসন। নাম ও সীমানা বদলালেও তৃণমূলের ভাগ্য বদলায়নি। ২০১১ সালে পার্থ চট্টোপাধ্যায় টানা তৃতীয়বার জয়ী হন। CPIM-এর অনুপম দেবসরকারকে ৫৯ হাজার ২১ ভোটে হারান। তবে ২০১৬ সালে লড়াই কঠিন হয়। CPIM প্রার্থী কৌস্তভ চট্টোপাধ্যায় জয়ের ব্যবধান নামিয়ে আনেন মাত্র ৮ হাজার ৮৯৬ ভোটে। ২০২১ সালে পার্থ চট্টোপাধ্যায় পঞ্চমবারের মতো জয় পান BJP প্রার্থী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়কে ৫০ হাজার ৮৮৪ ভোটে পরাজিত করে।
লোকসভা নির্বাচনেও বেহালা পশ্চিমে তৃণমূল কংগ্রেস তার দখল বজায় রেখেছে। ২০০৯ সালের পর থেকে হওয়া ৪টি লোকসভা নির্বাচনেই এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল এগিয়ে থেকেছে। ২০০৯ সালে CPIM-এর থেকে ৩৫ হাজার ৩৮৬ ভোটে এবং ২০১৪ সালে ২৩ হাজার ১৩৮ ভোটে এগিয়ে ছিল তারা। ২০১৯ সাল থেকে CPIM-এর জায়গায় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে BJP। কিন্তু তাতেও তৃণমূলকে সরানো যায়নি। ২০১৯ সালে তৃণমূল BJP-র থেকে ১৬ হাজার ১৬৫ ভোটে এবং ২০২৪ সালে ১৫ হাজার ১৯৬ ভোটে এগিয়ে ছিল।
২০২৪ সালে বেহালা পশ্চিমে নথিভুক্ত ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ১৮ হাজার ৩০১। যা ২০২১ সালের ৩ লক্ষ ১৩ হাজার ১৯৮ থেকে বেড়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে ভোটার ছিল ২ লক্ষ ৯৫ হাজার ৫৩২। ২০১৬ সালে ২ লক্ষ ৯৪ হাজার ৪০৪ এবং ২০১১ সালে ২ লক্ষ ৬০ হাজার ৯৫৫। কোনও নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠী এখানে প্রভাবশালী নয়। মুসলিম ভোটার প্রায় ৫.৭০ শতাংশ এবং তফসিলি জাতি প্রায় ৪.৮০ শতাংশ। এটি সম্পূর্ণ শহুরে কেন্দ্র, কোনও গ্রামীণ ভোটার নেই। শহুরে কেন্দ্র হিসেবে ভোটদানের হার তুলনামূলকভাবে ভাল। তবে ধীরে ধীরে কিছুটা অনীহা দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে লোকসভা নির্বাচনে। বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল ২০১১ সালে ৭৭.৮৩ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৭৫.৪৯ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৭৪.১৫ শতাংশ। লোকসভা নির্বাচনে ২০১৯ সালে ছিল ৭৩.৫৩ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের থেকে চার শতাংশেরও বেশি কমে নেমে আসে ৬৯.১৬ শতাংশে।
বেহালা কলকাতা অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বসতিপূর্ণ এলাকা, যার ইতিহাস ঔপনিবেশিক শহরেরও আগের। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের মতো পুরনো জমিদারি বংশের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে। কলকাতা, কালীঘাট ও গঙ্গাসাগরের মধ্যে বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার পুরনো পথ ধরে এই এলাকার বিকাশ ঘটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেহালা একটি ঘনবসতিপূর্ণ, মিশ্র চরিত্রের এলাকায় পরিণত হয়ে উঠেছে। শুধু আবাসিক এলাকা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
আজ বেহালা পশ্চিম কলকাতা পুরসভার দক্ষিণাংশে ডায়মন্ড হারবার রোড বরাবর বিস্তৃত এবং কলকাতার নগরায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বেহালা বিমানবন্দর ও ফ্লাইং ক্লাব, বড়িশার সাবর্ণ সংগ্রহশালা, ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর বাড়ি, বেহালা চৌরাস্তা ও সাখেরবাজারের মতো ব্যস্ত মোড়, অসংখ্য স্কুল, বাজার ও ক্লাব, সব মিলিয়ে এটি দক্ষিণ কলকাতার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
যোগাযোগ ব্যবস্থাও শক্তিশালী। ডায়মন্ড হারবার রোড বেহালাকে সরাসরি ময়দান ও মধ্য কলকাতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাস ও অটো পরিষেবায় এসপ্ল্যানেড, হাওড়া ও শহরের অন্যান্য অংশে যাতায়াত সহজ। বেহালা চৌরাস্তা সহ বিভিন্ন স্টেশন নিয়ে, নতুন জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো করিডর দ্রুত যাতায়াতের একটি নতুন বিকল্প এনে দিয়েছে। যদিও এই অংশে এখন আর ট্রাম চলে না। হাওড়া স্টেশন সড়কপথে প্রায় ১০–১২ কিমি দূরে, শিয়ালদা প্রায় ১২–১৫ কিমি। দমদমের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রায় ২৫–৩০ কিমি দূরে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বেহালা পশ্চিমের দক্ষিণে রয়েছে জোকা ও ঠাকুরপুকুরের মতো এলাকা, আর বারুইপুর প্রায় ২২–২৫ কিমি দূরে। হুগলি নদীর তীর ধরে আরও দক্ষিণে ডায়মন্ড হারবার শহর প্রায় ৩৮–৪০ কিমি দূরে। উত্তরে ও পূর্বে, উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত বেহালা থেকে সড়কপথে প্রায় ৩৫–৪০ কিমি দূরে। নদীর ওপারে হাওড়া জেলা ও হাওড়া শহর প্রায় ১০–১২ কিমি দূরত্বে, যা আবার হুগলি জেলার শহরগুলির প্রবেশদ্বার হিসেবেও কাজ করে।
কাগজে-কলমে ২০২৬ সালের নির্বাচন শুরুর আগেই তৃণমূল কংগ্রেস এখানে প্রায় অপ্রতিরোধ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। টানা ৯টি নির্বাচনে প্রথম স্থান, যার মধ্যে ৫টি বিধানসভা জয় ও ৪টি লোকসভা লিড রয়েছে তাদের ঝুলিতে। BJP এখনও পর্যন্ত এখানে তৃণমূলের সামনে ধোপে টিকতে পারেনি। তবে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোট দুর্বল হলেও পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক নয়। ২০২১ সালে তারা এখানে ২০.৫০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১৭.০৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
তবে তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দলের অভ্যন্তরেই। ৫ বারের বিধায়ক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়া দলের জন্য বড় প্রশ্ন। শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে মূল অভিযুক্ত হিসেবে ED-র হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর ২০২২ সালে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে দল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। যদিও তিনি এই মুহূর্তে জামিনে মুক্ত এবং এলাকার বর্তমান বিধায়কও। ফলে তিনি আইনত ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। যদিও তাকে দলে ফেরানো হলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীরব সমর্থন নিয়ে অভিযোগ উঠতে পারে। আবার তিনি যদি নির্দল হিসেবে লড়াইয়ে নামেন এবং তৃণমূলের ভোট ভাগ করেন, তাহলে বেহালা পশ্চিমের সমীকরণ আমূল বদলে যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে BJP বা এমনকী বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোট এই আসনে কোনও সুবিধা করে ফেলতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার। সেক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য শাসকদলকে প্রথমবারের জন্য বেহালা পশ্চিম থেকে হারানো সম্ভব হবে।
Srabanti chatterjee
BJP
Nihar bhakta
CPI(M)
Nota
NOTA
Sanat kumar bhakat
IND
Amal dhali
BSP
Mridul ojha
IND
Aruna ray
IND
Vijay kumar singh
IND
Kaustav chatterjee
CPM
Harikrishna dutta
BJP
Nota
NOTA
Mrityunjoy roy
SUCI
Pushpa dhali
BSP
Tapan debnath
IND
Vijay kumar singh
IND
Bipul kumar das
IND