
হিঙ্গলগঞ্জ উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবনের শেষ সীমায় অবস্থিত একটি দুর্গম নদীবিধৌত তফসিলি জাতি (SC) সংরক্ষিত বিধানসভা কেন্দ্র। এক সময় যেখানে বামফ্রন্টের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, বর্তমানে সেখানে মূল লড়াই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার অন্তর্গত হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকটি সুন্দরবনের উত্তর প্রান্তে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এটি কমিউনিস্টদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই দুর্গ ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস প্রবেশ করেছে। ১৯৬৭ সালে গঠিত হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রটি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত এবং এর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ হিঙ্গলগঞ্জ ব্লক, হাড়নাবাদ ব্লকের পাঁচটি...
হিঙ্গলগঞ্জ উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবনের শেষ সীমায় অবস্থিত একটি দুর্গম নদীবিধৌত তফসিলি জাতি (SC) সংরক্ষিত বিধানসভা কেন্দ্র। এক সময় যেখানে বামফ্রন্টের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, বর্তমানে সেখানে মূল লড়াই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার অন্তর্গত হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকটি সুন্দরবনের উত্তর প্রান্তে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এটি কমিউনিস্টদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই দুর্গ ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস প্রবেশ করেছে। ১৯৬৭ সালে গঠিত হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রটি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত এবং এর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ হিঙ্গলগঞ্জ ব্লক, হাড়নাবাদ ব্লকের পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং সন্দেশখালি–২ ব্লকের খুলনা গ্রাম পঞ্চায়েত। এটি বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের অধীন সাতটি বিধানসভা অংশের একটি।
হিঙ্গলগঞ্জের নামকরণ হয়েছে ১৭৮১ সালে যশোর জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টিলম্যান হেনকেলের নাম অনুসারে। তিনি এই অঞ্চলের বসতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই কেন্দ্রটি মোট ১৪ বার বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ১৯৭৭ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত টানা সাতটি নির্বাচনে সিপিআই(এম) জিতে প্রায় তিন দশক ধরে আসনটি দখলে রেখেছিল। সিপিআই এখানে ১৯৬৯ এবং ২০১১ সালে দু’বার জয়ী হয়। ১৯৬৭ সালের প্রথম নির্বাচনে একজন নির্দল প্রার্থী জয় পান। সাম্প্রতিক দুটি নির্বাচনে টানা জয় দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বামেদের দীর্ঘদিনের দুর্গ ভেঙে দিয়েছে।
২০১১ সালে সিপিআই প্রার্থী আনন্দময় মণ্ডল তৃণমূলের দেবেশ মণ্ডলকে মাত্র ১,০১৫ ভোটে হারিয়ে বামেদের মোট নবম জয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু ২০১৬ সালে ছবিটা বদলে যায়। দেবেশ মণ্ডল জয়ী হয়ে ৩০,৩০৪ ভোটের ব্যবধানে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সাফল্য এনে দেন হিঙ্গলগঞ্জে। ২০২১ সালেও দেবেশ মণ্ডল আসন ধরে রাখেন, বিজেপির নিমাই দাসকে ২৪,৯১৬ ভোটে পরাজিত করে। একসময়ের অপ্রতিরোধ্য বামফ্রন্ট কার্যত ধসে পড়ে।সিপিআই ভোট পায় মাত্র ৩.০৯ শতাংশ, জামানত পর্যন্ত হারায়। আগের নির্বাচনের তুলনায় তাদের ভোটশেয়ার কমে যায় ৩২.৯৭ শতাংশ পয়েন্ট, আর প্রায় পুরোটাই যায় বিজেপির ঝুলিতে, যাদের ভোটশেয়ার ২০১১ থেকে ২০২১-এর মধ্যে প্রায় একই হারে বেড়েছে।
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে যেখানে ২০০১ ও ২০০৬ সালে পরাজয়ের পর ২০১৬ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রথম জয়ের জন্য, লোকসভা নির্বাচনে হিঙ্গলগঞ্জ অংশে তাদের পারফরম্যান্স বরাবরই ভালো। ২০০৯ সালে তারা সিপিআইয়ের থেকে ১,৭৭৪ ভোটে পিছিয়ে ছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে ১২,৭১৩ ভোটে এগিয়ে যায়। ২০১৯ সাল থেকে সিপিআইয়ের জায়গা দখল করে বিজেপি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে। তবুও তৃণমূল ২০১৯ সালে ২২,২২৭ ভোট এবং ২০২৪ সালে ১০,৫০৭ ভোটে এগিয়ে থাকে। বিজেপির ভোটশেয়ার ২০০৯ সালে ৮.৩৫ শতাংশ ও ২০১৪ সালে ১২.৮০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৪০.৫০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৪৩.৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে সিপিআইয়ের ভোটশেয়ার ২০০৯ সালের ৪৩.৯৯ শতাংশ ও ২০১৪ সালের ৩৭.২১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২০১৯ সালে ৩.৩১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৩.৮৪ শতাংশে—যা হিঙ্গলগঞ্জে বামেদের প্রায় সম্পূর্ণ প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার প্রমাণ।
ভৌগোলিকভাবে হিঙ্গলগঞ্জ ইছামতি–রায়মঙ্গল সমভূমির অংশ। যা নিম্ন গঙ্গা ব-দ্বীপের অন্তর্গত এবং উত্তর ২৪ পরগনার তিনটি প্রধান ভৌম-প্রাকৃতিক অঞ্চলের একটি। এখানকার মাটি কালো বা বাদামি দোঁআশ থেকে শুরু করে নবীন পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত, যা ধান, পাট ও অন্যান্য ফসলের জন্য উপযোগী। অঞ্চলটি নিচু ও জোয়ারভাটা নদী-খালে ভরা, ফলে প্রায়ই বন্যা, লবণাক্ত জল ঢুকে পড়া এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে। রায়মঙ্গল, ইছামতি, কালিন্দি, রয়মঙ্গল ও গোমর নদী এই এলাকায় জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে-যেগুলি একদিকে জীবিকার উৎস, অন্যদিকে দুর্যোগের ঝুঁকির কারণ।
হিঙ্গলগঞ্জের মানুষ জীবিকার ক্ষেত্রে মূলত কৃষি, মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক বনজ কাজের উপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ মানুষই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক কিংবা কৃষিশ্রমিক। এখানে বড় শিল্প নেই বললেই চলে, পরিকাঠামোও সীমিত। বহু গ্রাম এখনও নৌকা ও ফেরির উপর নির্ভর করে যাতায়াত করে, যদিও কাঁচা-পাকা রাস্তা, হাটবাজার, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় জীবিকাকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
সড়কপথে হিঙ্গলগঞ্জ থেকে বসিরহাট মহকুমা সদর প্রায় ২৭ কিমি, জেলা সদর বারাসত প্রায় ৭০ কিমি এবং কলকাতা প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিমি দূরে। বসিরহাট ও হাসনাবাদ এলাকার কাছাকাছি রেলস্টেশনগুলি থেকে শিয়ালদহমুখী লোকাল ট্রেন চলে, যা প্রায় ৭০–৯০ কিমি পথ।
এই কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি। যেখানে হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের কিছু অংশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমানা নির্দেশকারী নদীপথ থেকে মাত্র কয়েক কিমি দূরে। কালিন্দি ও রায়মঙ্গল নদী এখানে প্রাকৃতিক সীমান্ত তৈরি করেছে, যার ওপারে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চল। সীমান্তের ওপারের বহু গ্রাম ভারতের দিক থেকে মাত্র ৫ থেকে ২০ কিমি দূরে, যদিও সীমান্ত চৌকি ও নদী টহলের মাধ্যমে চলাচল নিয়ন্ত্রিত।
২০২৪ সালে হিঙ্গলগঞ্জে মোট ভোটার ছিলেন ২,৩৪,৩৬৫ জন। যা ২০২১ সালে ২,২৮,৫০৮ জন, ২০১৯ সালে ২,২০,৫৭৯ জন, ২০১৬ সালে ২,১২,১৭২ জন এবং ২০১১ সালে ১,৮৫,০১৫ জন ছিল। তফসিলি জাতির ভোটার এই কেন্দ্রে সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় ৫৫.৯২ শতাংশ। তফসিলি উপজাতি ৬.৯৪ শতাংশ এবং মুসলিম ভোটার প্রায় ১৮.৫০ শতাংশ। এটি একেবারেই গ্রামীণ এলাকা—৯৪.৬৩ শতাংশ ভোটার গ্রামীণ এবং মাত্র ৫.৩৭ শতাংশ শহুরে। ভোটদানের হার এই কেন্দ্রে বরাবরই বেশি—২০১১ সালে ৮৫.৯৭ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৪.৩২ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৮৩.০৮ শতাংশ, ২০২১ সালে ৮৫.২৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৯.৯৯ শতাংশ।
গত এক দশকে হিঙ্গলগঞ্জে বিজেপির উত্থান যেমন ধারাবাহিক, তেমনই ব্যতিক্রমী। তারা প্রায় তৃণমূল কংগ্রেসের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। বিজেপির কাছে বাম-কংগ্রেস জোটের শক্ত পুনরুত্থান খুব একটা জরুরি নয়, কারণ তফসিলি জাতির বড় অংশের সমর্থন তারা ইতিমধ্যেই নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে। তবে মুসলিম ভোটে যদি কিছুটা ফাটল ধরে, সেটি বিজেপির পক্ষে সহায়ক হবে, কারণ এই ভোট সাধারণত তৃণমূলের দিকেই থাকে। সব মিলিয়ে এখনও তৃণমূল কংগ্রেস হিঙ্গলগঞ্জে সামান্য এগিয়ে, কিন্তু ব্যবধান খুব বেশি নয়। তাই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এখানে যে ভীষণ হাড্ডাহাড্ডি ও উত্তেজনাপূর্ণ হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
Nemai das
BJP
Ranjan kumar mondal
CPI
Nota
NOTA
Krishna gayen
IND
Nirmal mudi
BSP
Sanjit mondal
JASP
Anandamay mandal
CPI
Labanya mondal
BJP
Gayen ranjit
IND
Nota
NOTA
Nitish kumar biswas
BSP